মেনু নির্বাচন করুন

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঐতিহাসিক নিদর্শন ও প্রতণসম্পদে সমৃদ্ধ একটি জেলা। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের রাজধানী হিসেবে শিবগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও দর্শনীয় নিদর্শন হিন্দু শাসন আমলে বিশেষ করে সেন বংশের শেষ রাজাদের খননকৃত দিঘী ও সুলতানী আমলে মুসলিম সুলতানদের নির্মিত মসজিদই এ উপজেলার প্রধান ঐতিহাসিক স্থাপনা। তাছাড়া বৃটিশ আমলে স্থানীয় জমিদারদেরও কিছু স্থাপনা শিবগঞ্জে দেখা যায়। এই জেলার ঐতিহাসিক সহাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ছোট সোনা মসজিদ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিঃ মধ্যে নির্মিত), শিবগঞ্জ; দারসবাড়ি মসজিদ ও মাদ্রাসা (১৪৭৯ খ্রিঃ), শিবগঞ্জ; ধনাইচকের মসজিদ (১৫ শতকে নির্মিত), শিবগঞ্জ; খঞ্জনদীঘির মসজিদ (১৫ শতকে নির্মিত), শিবগঞ্জ; দাখিল দরওয়াজা (১২২৯ খ্রিঃ), শিবগঞ্জ; শাহ সুজার কাছাড়ি বাড়ি (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিঃ মধ্যে নির্মিত), শিবগঞ্জ; তোহাখানা মসজিদ (১৬৩৬-১৬৫৮ খ্রিঃ মধ্যে নির্মিত), শিবগঞ্জ; শাহ নেয়ামতুল্লাহ (রহঃ) এর মাজার (১৬৬৯ খ্রিঃ নির্মিত), শিবগঞ্জ; বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এর মাজার (সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে ১৯৭১ খ্রিঃ নির্মিত), শিবগঞ্জ; কানসাট রাজবাড়ি, শিবগঞ্জ; চাঁপাই জামে মসজিদ (৮৯৩ হিজরিতে নির্মিত), সদর উপজেলা; মহারাজপুরের প্রাচীন মসজিদ (মুঘল আমলে নির্মিত), সদর উপজেলা; মাঝপাড়া প্রাচীন মসজিদ (১৭৭৫ খ্রিঃ নির্মিত), সদর উপজেলা; রামচন্দ্রপুরহাটের নীলকুঠি (১৮৫৯-৬১ খ্রিঃ, নীল বিদ্রোহের সাক্ষী) সদর উপজেলা; বারঘরিয়া কাছাড়ি বাড়ি (বর্তমানে বিলুপ্ত), সদর উপজেলা; বারঘরিয়া ও মহারাজপুর মঞ্চ, সদর উপজেলা; জোড়া মঠ (নির্মাণকাল অজ্ঞাত), সদর উপজেলা; নওদা বুরতজ, গোমসতাপুর; এক গম্বুজ বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, গোমসতাপুর; শাহপুর গড় (বাদশাহি আমলের রাজধানী সুরক্ষা বেষ্টনী), গোমসতাপুর; জাগলবাড়ি ঢিবি (৮ম শতাব্দী), ভোলাহাট; ছোট জামবাড়িয়া দারতস সালাম জামে মসজিদ, ভোলাহাট; বড়গাছী দক্ষিণ টোলা বাজার জামে মসজিদ, ভোলাহাট; রেশম কুটির ও চিমনি, ভোলাহাট; আলী শাহ্পুর মসজিদ, নাচোল; রাজবাড়ি, নাচোল; কেন্দুয়া ঘাসুড়া মসজিদ, নাচোল; কলিহার জমিদারবাড়ি, নাচোল; মল্লিকপুর জমিদারবাড়ি, নাচোল।

 

ছোট সোনা মসজিদঃ

ছোট সোনামসজিদ ‘সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন’ বলে আখ্যাত। এটি বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতির ফিরোজপুর কোয়াটার্স এর তাহখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বিশাল এক দিঘির দক্ষিণপাড়ের পশ্চিম অংশ জুড়ে এর অবস্থান। মসজিদের কিছু দূর পশ্চিমে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিপ্তর কর্তৃক কয়েক বছর পূর্বে নির্মিত একটি আধুনিক দ্বিতল গেষ্ট হাউস রয়েছে। গেষ্ট হাউস ও মসজিদের মধ্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি আধুনিক রাস্তা চলে গেছে। মনে হয় রাস্তাটি পুরনো আমলের এবং একসময় এটি কোতোয়ালী দরওয়াজা হয়ে দক্ষিণের শহরতলীর সঙ্গে গৌড়-লখনৌতির মূল শহরের সংযোগ স্থাপন করেছিল।

ছোট সোনামসজিদ

 

প্রধান প্রবেশ পথের উপরিভাগে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপিতে নির্মানের সঠিক তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলি মুছে গেছে। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর নামের উল্লেখ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মসজিদটি তার রাজত্বকালের (১৪৯৪-১৫১৯) কোন এক সময় নির্মিত।

ছোট সোনামসজিদের মূল ফটক

 

ছোট সোনামসজিদের প্রস্তর লিপি:

মসজিদের দরজাগুলোর প্রান্তদেশ বলিষ্ঠ শোভাবর্ধক রেখা দিয়ে ঘেরা। কিন্তু খোদাই কাজটি অগভীর এবং অট্টালিকাটির খুব নিকটে না পৌছলে এ খোদাই কাজ চোখে পড়ে না। দরজাগুলোর মধ্যবর্তী কুলঙ্গীগুলোতেও রয়েছে একই অগভীর খোদাই। মধ্য দ্বারের উপরস্থ লিপিটির অনুবাদঃ ‘দয়াময় ও করুণাময় আল্লাহর নামে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন যে, আল্লাহ ও বিচার দিনের উপর আর কাউকে ভয়করোনা।’ যারা আল্লাহর মসজিদ তৈরী করেন তারা শীঘ্রই পথ প্রদর্শিতদের অন্তর্ভূক্ত হবে এবং নবী (সাঃ) বলেন যে, আল্লাহর জন্য যে একটি মসজিদ নির্মাণ করে, তার জন্য অনুরূপ একটি গৃহ বেহেস্তে তৈরী করা হবে। এ মসজিদের নির্মাণ কার্য সুলতানগণের সুলতান, সৈয়দগণের সৈয়দ, পবিত্রতার উৎস, যিনি মুসলমান নর-নারীর উপর দয়া করেন, যিনি সত্য কথা ও সৎ কাজের প্রশংসা করেন, যিনি ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষক, সেই আলাউদ্দুনীয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুযাফ্ফর হোসেন শাহ্ সুলতান আল হোসাইনী, (আল্লাহ তাঁর রাজ্য ও শাসন চিরস্থায়ী করেন) এর রাজত্বকালে সংঘটিত হয়। খালেছ ও আন্তরিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রেখে ওয়ালী মনসুর, কর্তৃক জামে মসজিদ নির্মিত হয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ ইহকাল ও পরকাল উভয়স্থানে তাকে সাহায্য করেন। এর শুভ তারিখ হচ্ছে আল্লাহর রহমতের মাস রজবের ১৪ তারিখ। এর মূল্য এবং মর্যাদা বর্ধিত হোক।’’ এই লিপিটির মধ্যম লাইনে তিনটি শোভাবর্ধক বৃত্ত রয়েছে। প্রত্যেকটিরমধ্যে রয়েছে আল্লাহর নাম। মধ্যম বৃত্তটির মধ্যে রয়েছে ‘ইয়া আল্লাহ’ (ও আল্লাহ) ডানদিকে বৃত্তটির মধ্যে রয়েছে ‘ইয়া হাফিয’ ( ও রক্ষক) এবং বামদিকের বৃত্তটির মধ্যে ‘ইয়া রহিম’ (ও দয়াময়)। অলংকরণের ক্ষেত্রে যে সোনালি গিল্টির ব্যবহার থেকে এর ‘সোনা মসজিদ’ নামকরণ হয়েছে তা এখন আর নেই।মসজিদ প্রাঙ্গণের চতুদিকে পূর্বে একটি বহির্দেয়াল ছিল। পূর্ব পশ্চিমে ৪২ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৪৩ মিটার লম্বা এ বহির্দেয়ালের পূর্বদিকের মধ্যবর্তী স্থানে একটি ফটক ছিল। শুধু ফটকটি ছাড়া সমগ্র বহির্দেয়াল এখন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে স্থানে স্থানে এখনও এর চিহ্ন সুস্পষ্ট। বর্তমানে মূল চৌহদ্দি দেওয়ালের স্থলে কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়েছে। স্থানীয় ভাবে জানা যায় যে, ফটকের নিকটে এবং দিঘির দক্ষিণপাড়ে এক সময় সোপানবিশিষ্ট একটি পাকা ঘাট ছিল।

মসজিদটি ইট ও পাথরে নির্মিত। এ মসজিদের মূল ইমারত আয়তাকার এবং বাইরের দিকে উত্তর-দক্ষিণে ২৫.১ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫.৯ মিটার। চারটি দেওয়ালই বাইরের দিকে এবং কিছুটা অভ্যন্তরভাগেও গ্রানাইট পাথরখন্ডের আস্তরন শোভিত। ১৮৯৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে ধ্বংসলীলার পর সংস্কার কাজের সময় পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ অংশে পাথরের আস্তরন অপসারিত হয়েছে। মসজিদের বাইরের দিকে চার কোণে চারটি বহুভূজাকৃতির বুরুজের সাহায্যে কোণগুলিকে মজবুত করা হয়েছে। এ বহুভুজ বুরুজের নয়টি অংশ বাইরে থেকে দেখা যায়। পেছন দেয়ালের মধ্যবর্তীস্থলে কেন্দ্রীয় মিহরাবের বাইরের দিকে আয়তাকার একটি বর্ধিত অংশ রয়েছে। কার্নিসগুলো ধনুকের মতো বাঁকানো এবং ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের জন্য ছাদের কিনারায় পাথরের নালি বসানো আছে। মসজিদের পূর্বদিকের সম্মুখভাগে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। পূর্ব দেয়ালের খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার বরাবর পশ্চিম দেয়ালের অভ্যন্তরে রয়েছে পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব। অধিকাংশ মিহরাবের পাথর সরিয়ে নেয়ার ফলে এখন সমগ্র পশ্চিম দেওয়াল অনাবৃত হয়ে পড়েছে; অথচ এক সময় এ দেয়ালই ছিল মসজিদের সর্বাপেক্ষা সুদৃশ্য অংশ।

মসজিদের ২১.২ মি Í১২.২ মি পরিমাপের অভ্যন্তরভাগ প্রতি সারিতে চারটি করে দুসারি প্রস্তর স্তম্ভ দ্বারা উত্তর দক্ষিণে লম্বা তিন স্তরে বিভক্ত। একটি বিস্তৃত কেন্দ্রীয় নেভ স্তরগুলোকে সমান দুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রতি ভাগে রয়েছে ৩.৫ মিটার বাহুবিশিষ্ট ছয়টি সমান বর্গাকার ইউনিট। মসজিদের অভ্যন্তরভাগে তাই মোট পনেরোটি ইউনিট রয়েছে যার মধ্যে তিনটি আয়তাকার ইউনিট চৌচালা খিলান ছাদ দ্বারা আচ্ছাদিত। বাকি বারোটি বর্গাকৃতি ইউনিটের প্রত্যেকটি উল্টানো পানপাত্র আকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। এগুলোর সবই স্বতন্ত্র পাথরের স্তম্ভ ও ভবনের সঙ্গে যুক্তস্তম্ভ শীর্ষে বসানো বিচ্ছুরিত খিলানের উপর স্থাপিত। কিন্তু ইউনিটগুলোর খিলানের মধ্যবর্তী উপরের কোণগুলি গম্বুজ বসানোর উপযোগী করার জন্য করবেল পদ্ধতিতে ইটের পেন্ডেন্টিভ দ্বারা বন্ধ করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে উপরিভাগে দোতলার কায়দায় নির্মিত একটি রাজকীয় গ্যালারি রয়েছে। গ্যালিরিটি এখনও ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় বিদ্যমান। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে ছিল গ্যালারির প্রবেশপথ। দরজার সঙ্গে সংযুক্ত একটি সোপানযুক্ত প্লাটফর্ম হয়ে গ্যালারিতে পৌঁছাত। গ্যালারির সম্মুখভাগে রয়েছে একটি মিহরাব।

মসজিদের অলংকরণের ক্ষেত্রে খোদাইকৃত পাথর, ইটের বিন্যাস, পোড়ামাটির ফলকের গিল্টি ও চকচকে টালি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এগুলোর ভেতর প্রাধান্য পেয়েছে খোদাইকৃত পাথর। ক্রাইটন ও কানিংহাম মসজিদটির ছাদের উপর পনেরোটি গম্বুজ ও খিলান ছাদের সবগুলোই গিল্টি করা দেখতে পান। কিন্তু বর্তমানে গিল্টির কোন চিহ্ন নেই। পাথর খোদাইয়ের নকশার ধরন নির্বাচন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিসরের উপযোগিতা অনুযায়ী। যেমন, প্যানেলের কিনারগুলিতে করা হয়েছে লতাপাতার নকশা এবং এদের অভ্যন্তরভাগে হিন্দু আমলের শিকল ও ঘন্টার মোটিফ অনুসরনে বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্তরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। খিলানের স্প্যান্ড্রিল ও ফ্রেমের উপরের স্থানগুলি আকর্ষনীয় অলংকরণরীতিতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে খোদাই করা গোলাপ দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। গম্বুজ ও খিলান ছাদের অভ্যন্তর ভাগে পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অলংকৃত; তবে খিলান ছাদের অলংকরণ করা হয়েছে স্থানীয় কুঁড়েঘরের বাঁশের ফ্রেমের অনুকরণে। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় অলংকরণ হলো কোণের বুরুজের খোদাইকৃত পাথরের বেষ্টনী এবং দ্বারপথ ও ফ্রেমের উপরে বসানো পাথরের কার্নিস ও অলংকরণ রেখা। উল্লেখ্য, সম্মুখের সবগুলি খিলানপথ ও মিহ্রাবের খিলানগুলি ছিল খাঁজবিশিষ্ট এবং এগুলো অনেকাংশে এ মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল।

মসজিদের প্রবেশদ্বারের মতোই পূর্ব দিকের ফটকে একসময় বিভিন্ন নকশা খোদাইকৃত প্রস্ত্তর ফলকের আস্তরণ ছিল। কিন্তু এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত কিছু গোলাপ নকশা ছাড়া এসব অলংকরণের তেমন কিছই এখন আর নেই। ফটকের ১৪.৫ মিটার পূর্বদিকে একটি পাথরের প্লাটফর্ম রয়েছে যার আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৪.২ মিটার, পূর্ব-পশ্চিমে ৬.২ মিটার এবং উচ্চতা ১ মিটার। এর চার কোনে রয়েছে একটি করে প্রস্ত্তর স্তম্ভ। প্লাটফর্মের পরে কয়েকটি উর্ধ্বমুখী আয়তাকার ধাপ আছে এবং এ ধাপসমূহের পরিধি উপরের দিকে ক্রমশ হ্রাস হয়ে এসেছে। দুটি সমাধিতে রয়েছে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর কতিপয় নাম সম্বলিত অগ্রভাগ সরু পিপাকৃতির পাথরের সমাধিফলক। এখানে কারা সমাহিত আছেন তা সঠিক জানা যায়নি। কানিংহাম সমাধি দুটিকে মসজিদের নির্মাতা ওয়ালী মুহম্মদ ও তার পিতা আলীর বলে মনে করেন। ছোট সোনা মসিজিদের দৃষ্টিনন্দন রূপ অনেকটা হ্রাস পেলেও অদ্যাবধি এটি গৌড়-লখনৌতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইমারত এবং এ এলাকায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত নিদর্শন।

 

বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি:

মসজিদ প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুটি আধুনিক কবর রয়েছে। কবর দুটি উত্তর-দক্ষিণে ৪.১ মিটার পূর্ব-পশ্চিমে ৪.৭ মিটার এবং ১.৩ মিটার উঁচু ইটের প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। কবর দুটি বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হক-এর।

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বরিশালের রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৭ সালের ৫ অক্টোবর কাকুলপাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীতে যোগদান করেন। নিষ্ঠার সাথে প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর ১৯৬৮ সালের ২ জুন কমিশন প্রাপ্ত হন। ছয় মাস চাকুরী করার পর তিনি রিসালপুরস্থ মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং এ যোগদান করেন এবং সুদীর্ঘ ১৩ মাসের বেসিক কোর্সে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর সেখান হতে বোম্ব ডিসপোজাল কোর্স করেন এবং কোর অব ইঞ্জিনিয়ারস এর একজন সুদক্ষ অফিসার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনী যখন বাংলাদেশএক ধ্বংসযজ্ঞ ও পাশবিক অত্যাচারে লিপ্ত ছিল, তখন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কারাকোরামের বন্ধুর পার্বত্য সীমান্ত রক্ষীদের দৃষ্টি এড়িয়ে শিয়ালকোট সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় এলাকায় প্রবেশ করেন। ভারত হতে পরে তিনি বাংলদেশ সীমান্তে পৌঁছেন। শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্দেশে রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকার ৭ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে কাজ করছিলেন। তার যোগ্য অধিনায়কত্বে মুক্তিবাহিনী এক চরম বিভীষিকারূপে হানাদার বাহিনীর সকল স্তরের সৈনিকদের মধ্যে মহাত্রাসের সঞ্চার করেছিল। সিংহ শক্তিতে বলিয়ান মুক্তিসেনারা ঝাপিয়ে পড়লে শত্রুদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিগুলো একের পর এক পতন ঘটতে থাকে। তাদের আক্রমণ এত প্রবল ও ত্রাস সৃষ্টিকারী ছিল যে, একবার একটি শত্রু লাইনের উপর হামলা চালাবার পূর্ব মুহুর্তে প্রায় সহস্রাধিক শত্রুসেনা প্রাণের ভয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ ছেড়ে চলে যান। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মহানন্দা নদী অতিক্রম করে শত্রুসৈন্যদের ধ্বংস করার জন্য নবাবগঞ্জের দিকে অগ্রসর হন। ১৪ ডিসেম্বর তিনি শত্রুদের কঠিন ব্যুহ ভেদ করবার জন্য দুর্ভেদ্য অবস্থানগুলো ধ্বংস করছিলেন, যখন আর একটি মাত্র শত্রু অবস্থান বাকী রইল এমন সময় মুখোমুখি সংঘর্ষে বাংকার চার্জে শত্রুর বুলেটের আঘাতে বাংলার এই সূর্য সৈনিক শাহাদাৎ বরণ করলেন। দৃঢ় অথচ বজ্রশপথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে দুটি চোখ স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরীর মত সদা জাগ্রত থেকে ভবিষ্যতের স্বাধীন সোনালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিল তা স্তিমিত হয়ে গেল।১৫ ডিসেম্বর শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ প্রাঙ্গনে আনা হয়। অসংখ্য স্বাধীনতা প্রেমিক জনগণ, ভক্ত মুক্তিযোদ্ধা, অগণিত মা-বোনের নয়ন জলের আর্শীবাদে সিক্ত করে তাকে এখানে সমাহিত করা হয়।


Share with :

Facebook Twitter